গোড়ার কথা
আজ থেকে ৮১ বছর আগে, বাংলা ১৩৪৩ (ইংরাজি ১৯৩৬) সালে সার্পেন্টাইন লেনে চ্যাটার্জীদের একচিলতে জমিতে শিয়ালদহ অঞ্চলের কিছু মানুষ বারেয়াড়ি দুর্গা পূজা করার কথা ভাবেন। শ্রী শচীন্দ্র নাথ সান্যাল, শ্রী দক্ষজা নন্দী এবং শ্রী মনিমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে জন্ম হল 'শিয়ালদহ সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি'-র। পরবর্তী ক্ষেত্রে এই পূজা কমিটির দায়িত্ব ন্যস্ত হয় তৎকালীন অনেক খ্যাতনামা মানুষ যেমন সর্বশ্রী কিরণ চন্দ্র ঘোষ, বৈদ্যনাথ চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ তারক পোদ্দার, সুরেশ ভট্টাচার্য্য, সুরেন্দ্র নাথ ঘোষ, শিবপ্রসাদ সাহা, শৈলেশ আচার্য্য, নৃপেন বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রভাত বরণ মুখোপাধ্যায় প্রমুখদের হাতে।
 

সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার
সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি-র
ইতিহাস
৮২ বছরে পৌঁছতে গিয়ে আমাদের এই পূজা কমিটি অনেক অনন্য নজির সৃষ্টি করে ফেলেছে। যেমন- এই পূজা কমিটির সাথে ভীষণ ভাবে জড়িয়ে ছিলেন ভারতের আধুনিক সঙ্গীতের জনক শ্রী রাই চাঁদ বড়াল, সঙ্গীতাচার্য্য জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ, তাঁর ভাই চারু প্রকাশ ঘোষ, বাংলার প্রখ্যাত চলচ্চিত্রাভিনেতা অসিত বরণ, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ভারতের বিস্ময়কর যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী-সুরকার ভি. বালসারা, বিশিষ্ট সুরস্রষ্টা বংশীবাদক হিমাংশু বিশ্বাস, স্বাধীনতা সংগ্রামী রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী কালীপদ মুখোপাধ্যায়, বিপ্লবী বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী ও মনুজ সর্ব্বাধিকারী প্রমুখেরা। আজ এঁরা সকলেই প্রয়াত।

সেই ১৯৩৬ সালেই শিয়ালদহ সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি বিজয়া সম্মিলনী উপলক্ষে ভারতে প্রথম 'জলসা' শুরু করেন। মনে রাখবেন এই 'জলসা' কথাটা বাংলা শব্দ নয়, 'আরবি' শব্দ। এই পূজা কমিটির হাত ধরেই 'আরবি জলসা' বাংলা ভাষার অত্যন্ত প্রিয় শব্দ হয়ে উঠল। এই জলসায় গান গাইতে আসতেন- কে. এল. সাইগল, শচীন দেব বর্মণ, পঙ্কজ মল্লিক, ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য্য, পান্নালাল ভট্টাচার্য্য, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, ইলা বসু, তরুন বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, সুবির সেন সমেত বাংলার প্রায় সমস্ত শিল্পী বৃন্দ।
 
 
সার্পেন্টাইন লেনের একচিলতে জমিতে জায়গা না হওয়াতে স্বাধীনতার সমসাময়িক কালে এই পূজা উঠে আসে অতীতের সেণ্ট জেমস্ স্কোয়ার অধূনা সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে। মানুষের জীবনে যেমন বিবর্তন চলতে থাকে, এই পুজোও বিবর্তনের হাত থেকে বাদ যায়নি। প্রয়াত মনুজ সর্ব্বাধিকারীর নির্দেশে শিল্পী শ্রী রমেশ পাল হিমালয়-কন্যা রূপে 'মা দুর্গাকে' তৈরী করে সারা ভারতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। অনেক ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চললো এই পূজা কমিটির এগিয়ে চলা। ১৯৬০ সালে রজত জয়ন্তী, ১৯৮৫ সালে সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করেছি আমরা।

১৯৯৩ সালে এই পল্লীর মানুষ 'শিয়ালদহ সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি'-র গুরু দায়িত্ব শ্রী প্রদীপ ঘোষের হাতে অর্পণ করেন। চিরাচরিত মন্দির-মসজিদ-গীর্জ্জা পূজা মণ্ডপ থেকে সরে এসে ওনার সভাপতিত্বে শুরু হল নতুন করে পথ চলা। ১৯৯৫ সালে আমরা হীরক জয়ন্তী পালন করেছি। মণ্ডপ ছিল লোটাস টেম্পল-এর আদলে। ১৯৯৬ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের জন্ম শতবর্ষে আমরা নেতাজীকে শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে ইতিহাস ঘেটে তাঁর ব্যবহৃত 'কামাতামারু' জাহাজের আদলে পূজা মণ্ডপ তৈরী করে বিশ্বের মণ্ডপ সজ্জার ইতিহাসে এক রেনেসাঁর জন্ম দিলাম, শুরু হল আলোড়ন। ভীড় নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সরকারকে র‍্যাফ নামাতে হল-যা এক ইতিহাস। একের পর এক মণ্ডপ সজ্জার ইতিহাসে আমরা নতুনত্বের রেকর্ড গড়ে চলেছি।

১৯৯৬ সাল থেকেই শিয়ালদহ সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতিতে রূপান্তরিত হল, স্থান মাহাত্ম্য মনে রেখে। পূর্ব্বসূরীদের জলসার আয়োজন থেকে সরে এসে শ্রী প্রদীপ ঘোষের সভাপতিত্বে ২০ বছর কাল ধরে, জনহীতকর কার্য্যে আমরা লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করেছি। মানুষ যখন বাংলার পরিবর্তন চাইছিল তখন প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী বর্ষে (২০১০ সাল) আমরা 'দড়ি ধরে মারো টান - রাজা হবে খান খান' - এই পূজা মণ্ডপটি তৈরী করে প্রমাণ করেছি এই পূজা কমিটি আগে যা ভাবে - বাংলার মানুষ পরে তাই করে।
 
facebook twitter linkedin

Designed & Developed By: Binary Banyan.